বিলুপ্তির পথে আবহমান বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য (২য় পর্ব)

নুরুল আলম আলমাস

প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা আমাদের গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী কিছু ব্যবহার্য জিনিস সময়ের বিবর্তনে আজ বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এই আধুনিক যুগে আধুনিক পণ্য এবং আধুনিক কলাকৌশলের কাছে মার খেয়ে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে বসেছে বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের ধারন-বাহন করা সেই সব ব্যবহার্য জিনিসপত্র। বিলুপ্তপ্রায় এসব ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য কিছু নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে খড়মের স্মৃতিকথা।

খড়মঃ বাঙ্গালী ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন খড়ম। কাঠের তৈরী জুতা বা পাদুকাকে আগেকার দিনে ‘খড়ম’ নামে অভিহিত করা হতো। একখণ্ড কাঠ পায়ের মাপে কেটে সম্মুখভাগে একটি বর্তুলাকার কাঠের গুটি বসিয়ে খড়ম তৈরী করা হতো। সম্মুখভাগের গুটিটি পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের আঙ্গুলটি দিয়ে আঁকড়ে ধরা হতো। বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে খড়ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। অতি প্রাচীনকালে কেবলমাত্র জমিদার ও ভূ-স্বামীরা খড়ম ব্যবহার করলেও পরবর্তীতে খড়মের প্রচলন মোটামুটি সব শ্রেণীর মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ধারণা করা হয়, সত্তরের দশক পর্যন্ত খড়মের প্রচলন ছিল। তবে আশির দশকেও অনেক জায়গায় খড়মের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। এরপর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় কাঠের তৈরী বিশেষ ধরনের এ পাদুকা। ঐতিহ্যের স্মারক খড়ম বিলুপ্ত হলেও আজও তা স্মৃতি হিসেবে কেউ কেউ সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যবহৃত এরকম প্রাচীন একজোড়া খড়ম সংরক্ষিত আছে জৈন্তাপুর উপজেলার রামপ্রসাদের চৌধুরী বাড়িতে। বৃহত্তর জৈন্তিয়ার খ্যাতিমান জমিদার ও নিজপাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর দাদা মরহুম কানাই মোল্লার ব্যবহৃত খড়ম এখনও সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম।

বর্তমানে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর মেঝো পুত্রবধূ রাবেয়া খাতুনের সংরক্ষণে থাকা এই খড়মের সম্মুখভাগের বর্তুলাকার কাঠের গুটিটি উঠে গেলেও বাকি অংশ অবিকৃত অবস্থায় আছে। সম্মুখভাগের এই গুটিকে স্থানীয় ভাষায় ‘বৌলা’ বলা হতো। সংরক্ষিত এই খড়ম অনেকটা বর্তমানের হাইহিলের আদলে তৈরি হলেও এর দুই দিকই প্রায় সমান উচ্চতার।

খড়মের ব্যবহার সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর বড় মেয়ে বদরুন নেসা চৌধুরী জানান, আগেকার দিনে খড়ম শুধু চলার পথের সঙ্গী ছিল না বরং এটি ছিল আদর-আপ্যায়ন, সম্মান ও ভদ্রতার প্রতিক। বাড়িতে কোনো নতুন অতিথি এলে প্রথমেই সযত্নে একজোড়া খড়ম ও পানিভর্তি বদনা এগিয়ে দেওয়া হতো হাত-পা ধুয়া বা ওযু করার জন্য। খড়ম ও বদনার ব্যবহার দিয়ে আভিজাত্যের মাপকাঠিও পরিমাপ করা হতো বলে জানান তিনি।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট আউলিয়া হজরত শাহজালাল (রহ.) ১৪শ শতকে সিলেট এসেছিলেন খড়ম পায়ে দিয়ে। সিলেটের দরগা মহল্লায় মুফতি নাজমুদ্দিন আহমদের পারিবারিক তত্ত্বাবধানে তাঁর খড়ম সংরক্ষিত আছে বলে লোক মুখে প্রচলিত আছে।

কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গেছে কাঠের তৈরি এই খড়ম। সভ্যতার উৎকর্ষে এই আধুনিক যুগে খড়ম শুধুই স্মৃতি। প্লাস্টিক, রাবার, চামড়া দিয়ে তৈরী বাহারি জুতার এই যুগে খড়মের কথা কল্পনাই করা যায়না। এক সময়ের আভিজাত্যের প্রতিক খড়ম আজ শুধুই বইয়ের পাতায় স্মৃতি হয়ে আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে খড়মের ব্যবহার যেন রুপকথার গল্পের মতো।

সিএনবাংলা/একেজে/১৬ আগস্ট ২০২০

Sharing is caring!

 

 

shares