ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আবদুল কাদির জীবন
According to Samuel Johnson, `Language is the dress of thoughts. Without language one can’t be able to express his thought. It must be your Mother Language’
প্রতিটি জাতিরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিন আছে। বাংলাদেশ বিশ্বের একটি স্বাধীন জাতি ও দেশ হিসেবে এর ব্যতিক্রম নয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি স্মরণীয় দিন।ইংরেজিতে বলা হয় A Red Letter Day। ঐ দিন ভাষা আন্দোলনে শহীদদের সম্মানে জাতি মাথা নত করে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানায়।
বিশ্বের কোনো দেশে মাতৃভাষার জন্য এভাবে আন্দোলন হয়নি। যেটি হয়েছে বাংলা ভাষার জন্য। সেদিক দিয়ে বাংলা ভাষার একটি বিশেষ স্থান বিশ্বে আছে, যা সবার ঊর্ধ্বে।
মার্চ ১৯৪৮ ইংরেজি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ “ষ্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং” শিরোনামে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি ক্যাটেগরিক্যালী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবীকে নাকচ করে দিয়ে বলেন “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্দু, একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয়কে তুলে ধরে। তার মুল বক্তৃতা থেকে
“The State language therefore, must obviously be Urdu, a language that has been nurtured by a hundred million Muslims of this sub-continent, a language understood throughout the length and breadth of Pakistan and above all a language which, more than any other provincial language, embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and is nearest to the language used in other Islamic countries.”
জিন্নাহর এই ব্ক্তব্য সমাবর্তন স্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে “নো নো” বলে প্রতিবাদ করেন। জিন্নাহর এই বাংলা বিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে
মাতৃভাষা দিবস‘ হিসেবে বিশ্বে পালিত হচ্ছে। এই একুশে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কিন্তু দীর্ঘ ইতিহাস। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের পরিধিও ব্যাপক।
প্রথমেই একুশের ইতিহাসটি জেনে নেই —১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গেলেও ভারতবর্ষকে দ্বি-খন্ডিত করে যায়। একদিকে পাকিস্তান অপরদিকে ভারত। পাকিস্তানের আবার দু‘ভাগ হয়, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশী এবং তাদের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল তুলনামুলকভাবে কম এবং তাদের ভাষা ছিল উর্দু। তা‘সত্ত্বেও পাকিস্তানের জনক নামে খ্যাত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজে ঢাকায় বাংলা ভাষার ওপর আক্রমন পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার পূর্বে ঘোষণা করেন যে,“উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” তার কথার উত্তরে ঘটনাস্থলেই দু’জন ছাত্র বলেছিলেন, “না, না, না।” তার এই কথার বিরুদ্বে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ রুখে দাঁড়ায়। তারা মাতৃভাষার স্বাধীনতা চায়। আর সে থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মাতৃভাষা নিয়ে দাঙ্গা শুরু হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের নানাভাবে ঠকাতো। পূর্ব পাকিস্তানে পাট জন্মাতো। অথচ সস্থায় এখান থেকে পাট কিনে নিয়ে তারা নিজ এলাকায় জুট মিল বানিয়ে সেখানে পাটের জিনিস তৈরি করে পূর্ব পাকিস্তানে চড়া দামে বিক্রি করতো। এরূপ আরো উদাহরণ আছে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্যই তাদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়ে।
১৯৫২ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের ডাক দেয়। পশ্চিমা সরকার পাকিস্তানী মিলিটারীদের বলে দেয়, রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারী করতে। মিছিলের লোক দেখলেই যেন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় মিছিল বের করে। তাদের সঙ্গে সাধারন জনগণও যোগ দেয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী এই মাতৃভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিলেটারীরা গুলি ছুঁড়ে ছাত্রদের হত্যা করার জন্য। এতে মারা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিক, শফিক,বরকতসহ জব্বার ও সালামের মত আরো অনেক জনগণ। সেই শহীদদের স্মরনে তৈরী হয় প্রথম শহীদ মিনার। ছাত্র-ছাত্রীরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের বরণ করে। কিন্তু পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর এটা পছন্দ হলো না। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সেই শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলে। আবার ছাত্ররা রাস্তায় মিছিল বের করে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য। মিলেটারীরা তাদের গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে যায়।
এভাবে ৫৪, ৫৬, ৫৮, ৬০ সাল চলে যায়। এর মাঝে দফায় দফায় পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের লড়াই চলে। যুক্তফ্রন্টের নেতা শেখ মুজিবর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে জয়লাভ করে।কিন্তÍু তবু তাঁকে মন্ত্রীত্ব দেয়া হলো না। কারন তিনি বাংলা ভাষার দাবীদার ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তিনি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর শোষনের হাত থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়। অবশেষে ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ মুজিবর রহমান জেল থেকে বের হয়ে এসে পুনরায় তিনি ১৯৭০ এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও বাঙ্গালী বলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় বসতে পারেননি। অবশেষে তিনি আন্দোলনের ডাক দেন।
১৯৭১ এর ৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সের বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণ দেন। তখন পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীরা বুঝতে পারে যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে আর আটকে রাখা যাবে না। আর সে জন্যই ৭১ এর ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে তারা হানা দেয় পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে। রক্তে রঞ্জিত করে ঢাকা সহ বড় বড় শহরগলোর মাঠ-ঘাট-প্রান্তর।
২৬শে মার্চ থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রুখে দাঁড়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের মিলেটারীদের বিরুদ্ধে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু লোক পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে ছিল। এরা মাতৃভাষা বাংলার বিপক্ষে ছিল। তারা পাকিস্তানী মিলেটারীদের সহায়তা করত। নিজ দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিত পাকিস্তানী মিলেটারীদের হাতে। নিজ দেশের মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে এরা খেলা করত। পাকিস্তানী মিলেটারীদের হাতে নিজ দেশের মা-বোনদের তুলে দিত লজ্জা হননের জন্য। এরাই রাজাকার – আলবদর – আলসামস্ নামে পরিচিত হয়।
নয় মাস তুমুল লড়াইয়ের পর যুদ্ধ শেষ হয়। ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের মিলেটারীদের প্রধান সেনাপতি নিয়াজী যুদ্ধ বিরতির দলিলে সই করে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীরা হার মানে বাঙালীর কাছে। ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালীরা বিজয়ের মুখ দেখল। তারা পেল একটি স্বাধীন ভূ-খন্ড, যার নাম বাংলাদেশ এবং মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রীয়ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পরও পাকিস্তানের আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। বাঙালির মধ্যে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপলক্ষ উদযাপন ও ভাষার উন্নয়নের কাজ করার মানসিকতা তৈরিতে এ আন্দোলনের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মাতৃভাষা দিবস’ বা ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে, এবং একই সাথে একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসটি আরো নানাভাবে উদযাপিত হয় যার মধ্যে আছে, মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদযাপন, যা একুশে বইমেলা নামে সমধিক পরিচিত। এছাড়াও ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের ত্যাগের সম্মানে এ মাসেই ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক ‘একুশে পদক’। মানুষের ভেতর একুশের আবেগ পৌঁছে দিতে একুশের ঘটনা ও চেতনা নিয়ে রচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার দেশাত্মবোধক গান, নাটক, কবিতা ও চলচ্চিত্র। তন্মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ও আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব সূচিত হয়ে আসছে। রচনাগুলোর মধ্যে আছে – শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী রচিত নাটক কবর; কবি শামসুর রাহমান রচিত কবিতা বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯; জহির রায়হান রচিত উপন্যাস একুশে ফেব্রুয়ারি; বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান রচিত আর্তনাদ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া।
জাতির মাঝে যে চেতনার উন্মেষ হয়, তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে ঊনসত্তর থেকে একাত্তরে। একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য শহীদ দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের সমস্ত আন্দোলনের মূল চেতনা একুশে ফেব্রুয়ারি। তখন থেকেই বাঙালি উপলব্ধি করেছিল তার বাঙালি জাতীয়তাবোধ, তার সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী। এই সংগ্রামী চেতনাই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক আন্দোলন এই দু’ধারাকে একসূত্রে গ্রথিত করে মুক্তিসংগ্রামের মোহনায় এনে দিয়েছে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। একুশের চেতনাই বাঙালি জাতিকে দিয়েছে অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের প্রেরণা। ভাষা আন্দোলন জাতীয়তাবাদের প্রথম উন্মেষ। আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল ছিল বাঙালি জাতির আপন সত্তার উপলব্ধি এবং ঐক্যবদ্ধ হবার প্রেরণা। এ আন্দোলনই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার আন্দোলনের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই বাঙালিদের মাতৃভাষার উপর চরম আঘাত হানে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হলেও মূলত ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাঙালি জাতি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব এখানে যে এর মাধ্যমেই এ প্রদেশের মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী শিক্ষা লাভ করে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শাসকচক্রের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রেরণা দিয়েছে একুশের ভাষা আন্দোলনের রক্তরাঙ্গা ইতিহাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে তাই ভাষা আন্দোলনের ফল বলা যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এখন আমাদের কর্তব্য বাংলাভাষা চর্চার মাধ্যমে উন্নত জাতি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানো। এ দ্বারা আমরা প্রমাণ করতে পারব মাতৃভাষার প্রতি আমাদের মমতা আছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশি। ইসলাম মায়ের প্রতি যেমন অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি মাতৃভাষার প্রতিও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মায়ের ভাষার কথা বলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মাতৃভাষা মহান আল্লাহর অপার দান। এ ভাষা দিয়ে মানুষ নিজের মনের ভাষা প্রকাশ করে।
মহান আল্লাহ সব নবী-রাসূলকে স্ব-জাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছেন। যাতে তারা স্বীয় জাতিকে দ্বীনের দাওয়াত স্পষ্টভাবে পৌঁছাতে পারেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, আমি রাসূলগণকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (দ্বীন) স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। -সূরা ইবরাহিম: ৪
কোরআনে মাজিদের এ আয়াত থেকে ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব প্রতিভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনের পথে দাওয়াত দানকারীদের জন্য মাতৃভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের নির্দেশনাও পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি আপনার রবের পথে দাওয়াত দিন কৌশল ও উত্তম ভাষণের মাধ্যমে।’ –সূরা নাহল: ১২৫
কোরআনের এসব বর্ণনা দ্বারা এ কথা বুঝতে বাকী থাকে না যে, স্বজাতিকে উত্তম ভাষণের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার জন্য বিশুদ্ধ মাতৃভাষার ওপর পারদর্শিতা অর্জন অনিবার্য।
প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি আরবদের মধ্যে সবচে’ বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী।’ রাসূলের এ বাণী থেকে প্রমানিত হয়; বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল মাতৃভাষায় কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করা রাসূল (সা.)-এর আদর্শ।
আল্লাহদ্রোহী সম্রাট ফেরআউনকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার লক্ষ্যে হজরত মুসা (আ.) নিজ ভাই হজরত হারুন (আ.) কে সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। কারণ হজরত হারুন (আ.) খুব সুন্দর ও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে ও বুঝাতে পারতেন। এ প্রসেঙ্গে কোরআনে কারিমে এসেছে, ‘(হে প্রভূ) আমার ভ্রাতা হারুন আমার ছেয়ে সুন্দর ও স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে। সুতরাং তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন।’ –সূরা ক্বাসাস: ৩৪
তথাপি মহান আল্লাহর নিদর্শন হিসেবেও মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হওয়া ঈমানি কর্তব্য। কোরআন মজিদের বর্ণনা অনুযায়ী ভাষা বৈচিত্র মহান আল্লাহর অনুপম নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ –সূরা রুম: ২২
বর্ণিত এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও মহান আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। তাই এ ভাষার প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনসহ যত্নশীল হওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হওয়ার নির্দেশনায় শামিল।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মরিয়া হয়ে উঠেছিল উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। তাদের এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বাংলাভাষাভাষীরা গড়ে তুলেন তীব্র আন্দোলন। কিন্তু বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে মুখরিত করে তুলেন রাজপথ। এই দূর্বার আন্দোলনে শামিল হয়ে মায়ের ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেন এদেশের বহু ছাত্র-জনতা।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংগ্রামরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন বরকত, সালাম, জব্বার, শফিক ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেক বীর সন্তানেরা। এভাবে মাতৃভাষার জন্য রক্তদান বা শাহাদত বরণের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দীপ্ত শপথে উৎসর্গকৃত তাজা রক্তের বদৌলতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে এবং রক্তে রঞ্জিত ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় ভূষিত হয়। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা সৃষ্টিতে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনই প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল রক্তিম ইতিহাস জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে যুগ থেকে যুগান্তরে এটি আমাদের প্রত্যাশা।
বাঙালি তার স্বকীয়তা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। মায়ের মুখের ভাষার প্রাধান্য টিকিয়ে রাখতে নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে বুক চিতিয়ে দেওয়া। এই আত্মদান সম্পর্কে বড়ো বেশি দেরি করে বুঝেছেন বিশ্বনেতারা। বিশ্বস্বীকৃত এই ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলের সৈনিক ও বোধসৈনিক যারা তারা আমাদের রক্তমিতা।তারা আমাদের অহংকার।
লেখকঃ
সম্পাদক, দ্য আর্থ অব অটোগ্রাফ

Sharing is caring!

 

 

shares