মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব

সাজিদ মাহমুদ

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। দুনিয়ার সমস্ত জীবের উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। সমস্ত জীবকে মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যা প্রয়োগের মাধ্যমে অনায়াসে জগতের সকল প্রাণীকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বৃহদাকার একটি হাতি মানুষের দ্বারাই পরিচালিত হয়। পৃথিবীতে বহু প্রজাতির পাখি রয়েছে যাদেরকে মানুষ তাদের ভাষা রপ্ত করাতে পারে। কিন্তু আমরা কি একটি বারও চিন্তা করেছি যে, কোন কোন ক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্যের জন্য মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব সবার উপরে? মৌলিক যে সব বৈশিষ্ট্যের ফলে জগতের সকল জীবের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য হল। জ্ঞান:-আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ের জ্ঞান প্রদান করেছেন। যা অন্য কোন জীবকে দেন নি। এমন কি ফেরেশতাদেরকেও। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই ঘোষণা দিয়ে বলছেন- “আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন।” [বাক্বারাহ-৩১] পৃথিবীর এমন কোন জ্ঞান নেই যা মানুষকে শিক্ষা দেয়া হয় নি।

আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিস্কার মানুষের জীবন যাপন সহজলভ্য করেছে। এসব আবিস্কার মানুষের জ্ঞানের ফসল।জ্ঞান ছাড়া মানুষ অন্ধ। যে জাতি যতবেশি জ্ঞানী সে জাতি তত বেশি সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করে যদিও তারা সংখ্যাধিক্যে কম হয়। যার প্রমাণ বর্তমান ইহুদি জাতি। সংখ্যায় কম হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা পৃথিবীর সব জাতি গোষ্ঠীর চেয়ে এগিয়ে।

বাক শক্তি:-ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যম হচ্ছে বাকশক্তি বা ভাষা। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ নিজের আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করে।বাকশক্তি এমন একটি বিশিষ্ট গুণ যা মানুষকে জীবজন্তু ও পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক করে দেয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- “তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ।তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাষা।” [আর রাহমান-৩,৪] বিভিন্ন ভূখণ্ড ও বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন রকমের বাকপদ্ধতি বা ভাষা রয়েছে। আরবী,বাংলা ফারসী, হিন্দী, তুর্কী, ইংরেজী ইত্যাদি সহ পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজারের উপরে ভাষা আছে। কোন কোন ভাষা পরস্পর এত ভিন্নরূপ যে, এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয় না। এই ভাষার ভিন্নতাকে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর নিদর্শ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।পবিত্র কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে- “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।” [রুম-২২]

পার্থক্য জ্ঞান:-ভালো মন্দের পার্থক্য নির্ধারণের যোগ্যতা একমাত্র মানুষেরই আছে। অন্য সকল প্রাণী এ যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত। পার্থক্য জ্ঞান না থাকলে পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপন মসৃণ হতো না। অন্যায় অসত্যের অতল গহ্বরে মানুষ হারিয়ে যেতো। বিবেক:-বিবেকের মাধ্যমে মানুষ সত্য-মিথ্যা,ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করতে পারে।যে মানদন্ডের মাধ্যমে মানুষ সত্য সুন্দরের পথে পরিচালিত হয় তা হল বিবেক।বিবেককে মানুষের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে অভিহিত করা হয়। লোক চক্ষুর অন্তরালে কোন অন্যায় অপরাধ করলেও মানুষ বিবেকের তাড়নায় অনুশোচনায় ভুগতে থাকে।সৃষ্টি জগতের মধ্যে অন্য কোন জীব বিবেক প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে না।

বোধশক্তি:-বোধশক্তির মাধ্যমে মানুষ খুব সহজে, অল্প সময়ে কোন কঠিণ বিষয়কে অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। বোধ শক্তি সম্পন্ন মানুষরাই জাতির নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়। পবিত্র কুরআনে বোধশক্তিহীন লোককে নিকৃষ্ট জীব বধির,বোবার সাথে তুলনা করা হয়েছে।কুরআনের ঘোষণা- “নিশ্চয় আল্লাহ্‌র কাছে নিকৃষ্টতম বিচরণশীল জীব হছে বধির, বোবা, যারা বুঝে না।” [আনফাল-২২] অন্য আয়াতে চতুস্পদ জন্তুর চেয়ে নিকৃষ্ট তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। “আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।” [আ’রাফ-১৭৯]

বিশ্লেষণী শক্তি:-বিশ্লেষণী শক্তি হচ্ছে কোন কঠিণ বিষয়কে হৃদয়ঙ্গম করে অন্যের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন করে বুঝানোর যোগ্যতা ও দক্ষতা।বিশ্লেষণের যোগ্যতা সম্পন্ন লোক তার কথার দ্বারাই মানুষকে আকৃষ্ট করে।তার প্রতিটি কথায় থাকে মুগ্ধতার ছোঁয়া। জ্ঞানের যথাযথ ব্যবহারে আমাদেরকে কুরআনের জ্ঞান অর্জন।ভাষার মাধ্যমে মানুষকে চিরসত্য,চিরসুন্দর ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আহ্বান।পার্থক্যের মাধ্যমে সত্য সুন্দর গ্রহণ করে মন্দ পরিহার।বিবেক কাজে লাগিয়ে মানুষের তৈরী পথ ও মত ত্যাগ করে সিরাত্বয়াল মুস্তাকিমের পথে চলা। বোধশক্তির মাধ্যমে গভীরভাবে ইসলামকে অনুধাবন এবং বিশ্লেষণী শক্তির মাধ্যমে সহজ সরল পন্থায় ইসলামের সৌন্দর্য সবার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে। উপরোক্ত পন্থায় যদি মৌলিক এসব বৈশিষ্ট্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তাহলেই প্রকৃত অর্থে সমস্ত জীবের উপর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারবো। অন্যথায় মানুষ ও অন্যান্য জীবের মধ্যে কোন বৈপরীত্য থাকবে না।

লেখকঃ সাজিদ মাহমুদ, শিক্ষার্থী-সিলেট ল’কলেজ।

Sharing is caring!

 

 

shares