আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

সিরাজুল ইসলাম

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষিত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টি এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাজ। এ কাজগুলো আমাদের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিধৃত অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্র সাক্ষরতা নিয়ে বিস্তর কাজ করছে। বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিও এবং সুশীল সমাজ রাষ্ট্রের সহযাত্রী হয়ে আছেন। তবে রাষ্ট্র এ যাবত কাজগুলোর কতটুকু সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে তা আজ মূল্যায়নের সময় এসেছে। গ্লোবাল ভিলেজ কিংবা ডিজিটালাইজেশনের যুগে এসে সাক্ষরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখবেন, জানি। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের দিনেও অগণিত মানুষ যে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত সেটাও ধ্রুব সত্য। এখনো অনেক লোক নিজের নাম পরিচয় লিখতে পারেনা, একটাসাইনবোর্ড পড়তে পারেনা, কিংবা অনেকেই আছে জীবনে শিক্ষার ধারে কাছেও যায়নি। মূলত একারনেই সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ অবারিত করার লক্ষ্যেআন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের যাত্রা।

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের যাত্রা শুরু হয়। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষনা করে। ঐ বছর ইরানের রাজধানী তেহরানে ৮ হতে ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের মর্যাদা প্রদান করা হয়। তখন থেকেই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ এ দিনটি পালন করা শুরু করে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে।

ইউনেস্কো ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সাক্ষরতার একটি মৌলিক সংজ্ঞা নির্ধারন করেছিল। কালক্রমে সংজ্ঞারও পরিবর্তন হতে থাকে। ইউনেস্কোর পাশাপাশি অনেক দেশ তাদের অবস্থার প্রেক্ষিতে নিজেদের মতো করে সাক্ষরতার সংজ্ঞা নির্ধারন করেছে। একসময় অক্ষরজ্ঞান, বর্ণ পরিচয় কিংবা নিজের নাম লিখতে পারাকেই সাক্ষরতা ধরে নেয়া হতো। কিন্তু এ ধারনা এখন অনেক প্রসারিত হয়েছে। সাক্ষরতা বুঝাতে তিনটি শর্ত বেধে দেয়া হয়েছে- নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারা, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারা এবং দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশ করতে পারা। যিনি এ তিনটি পারবেন তাকে সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বলা হবে। এটি ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কোর দেয়া সাক্ষরতার পূন:সংজ্ঞা। তবে বর্তমানে এটিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখন বলাহচ্ছে- সাক্ষরতা সরাসরি ব্যক্তির জীবনমান পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে হবে।

এখন কথা হলো-সাক্ষরতার প্রয়োজন কেন? আসলে সাক্ষরতার বহুমাত্রিক ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সাক্ষরতার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে জানতে পারে। জানতে পারে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক, মানসিক ও পারিবারিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের গতিধারা। সাক্ষরতা ব্যক্তিকে স্বাধীনতা অর্জন, ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং দুনিয়ার কোথায়,কখন,কী ঘটছে- সে সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে। স্বাক্ষরতা ব্যক্তিকে গোটা সৃষ্টিজগত সম্পর্কে জানতে ও নিজেকে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন হতে সাহায্য করে। সর্বোপরি, সাক্ষরতা হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চালিকাশক্তি সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।

সাক্ষরতা যেমন উন্নয়ন ও অগ্রগতির হাতিয়ার, তেমনই এটি একটি অসাধারণ আন্দোলনের নাম। আমাদের দেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে, বিভিন্ন সময় সাক্ষরতা খাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর সার্বিক অবস্থা এখন কোথায় এসে ঠেকেছে তা অবলোকন করা দরকার। আমাদের দেশে ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫.৩ শতাংশ। ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী সাক্ষরতার হার ছিল ৫৯.৮২ শতাংশ।২০১৯ সালে তা ৭৩.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তা? শুধু বর্ণ বা অক্ষর পরিচয় থেকে যদি এ পরিসংখ্যান হয়ে থাকে তবে কথা ছিল না। ফলে সাক্ষরতার প্রকৃত সংজ্ঞার নিরিখে হিসাবটি প্রশ্নবিদ্ধ বটে। তথাপি হিসাবটি তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও দাঁড়ায়- বর্তমানে দেশে নিরক্ষর লোকের সংখ্যা ৩ কোটি ২৫ লাখ। এ বিশাল সংখ্যার প্রেক্ষিতে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামনে বিরাট এক চ্যালেঞ্জ।

শুধু শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করা নয়, জনসংখ্যাকে প্রকৃত অর্থে জনসম্পদেও রুপান্তর করতে হবে। না হয় জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের বা এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। এসডিজির ১৭ টি লক্ষের ৪ নম্বরটি হচ্ছে শিক্ষা। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তর্ভূক্তমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা, জীবন ব্যাপী শিক্ষার অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করা, দক্ষ ও মান সম্মত শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। সরকার, এনজিও ও সুশীল সমাজ এসডিজির ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে নানামূখী কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সার্বিক সাক্ষরতা ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে ২০৪১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে সহজ হবে।

Sharing is caring!

 

 

shares