বিলুপ্তির পথে আবহমান বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য (১ম পর্ব)

নুরুল আলম আলমাস

প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা আমাদের গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী কিছু ব্যবহার্য জিনিস সময়ের বিবর্তনে আজ বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এই আধুনিক যুগে আধুনিক পণ্য এবং আধুনিক কলাকৌশলের কাছে মার খেয়ে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে বসেছে বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের ধারন-বাহন করা সেই সব ব্যবহার্য জিনিসপত্র। বিলুপ্তপ্রায় এসব ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য কিছু নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে থাকছে ঢেঁকির স্মৃতিকথা।

ঢেঁকিঃ চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের একটি হচ্ছে ঢেঁকি। আগেকার দিনে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ধান ভানার জন্য ঢেঁকি ব্যবহৃত হতো। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ধান কাটার সাথে সাথে চাল করার জন্য ঢেঁকি নিয়ে মহিলাদের ব্যস্ততা বেড়ে যেতো। অনেকে পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান ভানতেন।

ঢেঁকিতে ধান ভানা নিয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার সেনগ্রামের বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছিলাম যারা ঢেঁকিতে ধান ভানতেন, ভানাতেন কিংবা ঢেঁকির কারুকাজ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। জমি আর ধানে এই গ্রামে ঐতিহ্যবাহী একটি পরিবার ছিল মরহুম সিলিম আলীর পরিবার। এ পরিবারের জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মতিউর রহমান। বাড়িতে ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানার স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেন, অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে ঢেঁকিতে ধান ভানার ব্যস্ততা বেড়ে যেতো। ধানের পরিমান বেশী হওয়ায় পেশাদার মহিলাদের দিয়েও ঢেঁকিতে ধান ভানানো হতো। ঢেঁকির নান্দনিক শব্দে তখন বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠতো।

ঢেঁকিতে ধান ভানার পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রামের বয়োবৃদ্ধা মহিলা মাহমুদা বেগম বলেন, ধানকে একটি গর্তে রেখে তার উপর ঢেঁকি প্রয়োগ করা হতো। সাধারণত মেঝেতে গোলাকার গর্ত করে ভালো করে লেপে তা শুকিয়ে নেওয়া হতো যাতে চাল কিংবা ধানে মাটি না লাগে। এই গর্তটিকে স্থানীয় ভাষায় ‘গাইল’ নামে ডাকা হতো। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভানার জন্য আলাদা একটি ঘর থাকতো যেটি ‘ঢেঁকির ঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

শক্তপোক্ত কাঠ দিয়ে ঢেঁকি নির্মাণ করা হতো যাতে মজবুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর দুইটি প্রান্তের এক প্রান্তে পা দিয়ে বল প্রয়োগ এবং অপর প্রান্তে ধান ভানার কাজ করা হতো। ঢেঁকিতে একদিকে পা দিয়ে বল প্রয়োগ করলে সামনের অংশ উপরে উঠে আসতো আবার পা ছেড়ে দিলে তা গর্তে থাকা ধানে আঘাত করে একে ভাঙ্গতো। পা দিয়ে যে পাশে আঘাত করা হতো সেই পাশটিকে ছোট দুটি খুঁটির উপরে ক্রস আকারে কাঠ দিয়ে আটকে দেওয়া হতো যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘সুরকুটি’ বলা হতো। এইভাবে ক্রমান্বয়ে বারবার পা দিয়ে আঘাত করে ঢেঁকি চালানো হতো। প্রতিবার পা দিয়ে আঘাত করাকে ‘পাড়’ বলা হতো।

ঢেঁকিতে কাজ করার জন্য কি পরিমান জনশক্তির প্রয়োজন হতো এই প্রশ্নের জবাবে গ্রামের আরেক বয়োবৃদ্ধা মহিলা ছয়ফুন নেছা জানান, বিশাল ওজনের ঢেঁকিতে দুই থেকে তিনজন পাড় দেওয়ার কাজটি করতেন। সাধারনত দুইজন একই সাথে মিলে পা দিয়ে ঢেঁকি চালাতেন বলে কষ্ট কিছুটা কম হতো। আরেকজন থাকতেন যিনি নিজের হাত কিংবা লাঠি দিয়ে গাইলে থাকা চাল কিংবা ধানকে বারবার নেড়ে দিতেন। এতে করে নিচে পড়ে যাওয়া ধান উপরে উঠে আসতো এবং ভানতে সুবিধা হতো। কিছুক্ষণ পর পর গাইল থেকে চাল কিংবা ধান সংগ্রহ করে কুলায় ঝেড়ে অবশিষ্টাংশ গাইলে ঢেলে দিয়ে আবার চালু করা হতো ঢেঁকি। এভাবেই ৪-৫ জনের একটি দল ঢেঁকিতে কাজ করতো। একজন ধান ভেনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আরেকজন ঢেঁকিতে গিয়ে পাড় দেওয়া শুরু করতো।

দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে বিরক্তি বা ক্লান্তি আসতো কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গল্পগুজব করে কাজ চলতো, মাঝে মাঝে পান খাওয়া হতো, কেউ কেউ সীমিত পরিসরে গীতও গাইতেন আর এভাবেই ক্লান্তি দূরীভূত করতেন।

সময়ের বিবর্তনে আধুনিক সভ্যতার উৎকর্ষে আজ হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যের স্মারক ঢেঁকি। ধান ভানার মেশিন আবিস্কারের পর থেকেই বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি। আগে গ্রামে যেখানে বাড়ি বাড়ি ঢেঁকি ছিলো আজ সেখানে ইঞ্জিন চালিত ধান ভানার মেশিনগাড়ি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভেনে দিচ্ছে। দুই দশক আগেও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংরক্ষন করা ঢেঁকি অনেকের বাড়িতে দেখা গেলেও আজ তা খুজে পাওয়া দুষ্কর। সূদুর অতীতের এই ঢেঁকিতে পা চালিয়ে কিভাবে ধান ভানা হতো তা নতুন প্রজন্মের কাছে রহস্য হয়েই থাকবে।

সিএনবাংলা/একেজে/১৪ জুলাই ২০২০

Sharing is caring!

 

 

shares