গুম: অনন্ত প্রতীক্ষার দুঃসহ যন্ত্রনা

গুম! গুম একটি আতংকের নাম, উদ্বেগের নাম। শংকা আর উৎকন্ঠার নাম গুম। নিখোঁজ ছেলের পথ পানে চেয়ে থাকা মায়ের অনিশ্চিত অপেক্ষার নাম গুম। স্বজন-প্রিয়জনের ফিরে আসা, না আসার দোলাচলে অবিরত অশ্রু বিসর্জনের নাম গুম। অসীম অনিশ্চয়তা, সীমাহীন অপেক্ষার প্রহরগোণাসহ আরো যতই বিষাদে গুমকে আখ্যা দেয়া হোকনা কেন, এর ভয়াবহতা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারে। “—-যার চলে যায় সে-ই বুঝে হায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রনা”।

গুম দিবস। ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। একটি দিবস এমনিতেই হয়ে যায়না। এর পেছনে অনেক কারন, ঘটনা ও অনুষঙ্গ বিদ্যমান থাকে। তাবত বিশ্বে গুমের ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে আন্তর্জাতিক বিদগ্ধ মহলে উৎকন্ঠা দেখা দেয়। এ অমানবিক গর্হিত অপরাধ কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন মানবতাবাদীরা। ফলে সারা বিশ্বে গুমের প্রকোপে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ নড়েচড়ে বসে। তারা কাজ শুরু করে ২০০২ সালে। ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা রচনা করে গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ। যার শিরোনাম- International Convention For Protection Of All Persons Against Enforced Disappearance. ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে এ সনদ কার্যকর হয়। নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে ও গুমের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জাতিসংঘ এ দিবসটির ঘোষনা দেয়। এরপর ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর ৩০ আগষ্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। গেল বছরের তথ্য অনুযায়ী ৪৩ টি দেশ উল্লেখিত সনদটি গ্রহণ করেছে। ৯৩ টি দেশ অনুস্বাক্ষর করেছে। আর যেসব রাষ্ট্র গুমের সাথে সম্পৃক্ত তারা এ সনদটি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি।

গুম কারা করে, কেন করে, কাকে করে? সাদামাটা জবাব- রাষ্ট্র তার প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধী কিংবা ভিন্নমত পোষনকারীদের দমনের জন্য গুম করে। গুমকে তারা নিরাপদ ও নির্ঝঞ্জাট মনে করে। আর দেশে দেশে চষে বেড়ানো টিকটিকিরা তাদের তথাকথিত দেশ ও জাতির জন্য যাদেরকে হুমকি মনে করে তাদেরকে তারা পথের কাটা ভেবে গুম করে সরিয়ে ফেলে। আবার কোনো দেশ বা দলের ভবিষ্যত সৎ-সাহসী বিচক্ষণ নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্যও তারা গুম নামক পৈশাচিক ভয়াল কায়দা গ্রহণ করে থাকে।

গুম হচ্ছে ভিন্নমতের ব্যক্তি ও দলকে দমিয়ে রাখার ভয়ংকর হাতিয়ার। হামলা, মামলা, জেল, জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, ক্রসফায়ার নামক অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেও সংশ্লিষ্টরা যখন প্রশান্তির ঢেকুর তুলতে ব্যর্থ হয়, যখন তারা নিশ্চিন্ত হতে পারেনা, যখন আতংক ছড়ানোর পায়তারা বুমেরাং হয়, তখন তারা হাতে তুলে নেয় গুম নামক ঘৃনিত ও পাশবিক অস্ত্র।

গুম মূর্তিমান এক আতংকের নাম। রাষ্ট্র কিংবা টিকটিকিরা যেকোন সময় তাদের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। গোপন স্থানে আটকে রাখে, কাউকে ইনফরমেশন দেয়না, আটকের ঘটনা স্বীকার করেনা। কিছুদিন পর বা অনেক দিন পর হয়তো ঐ ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়, আবার কখনো লাশই পাওয়া যায়না। কখনোবা গুম হওয়া ব্যক্তি বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে আসে আবার কখনো ফিরে আসার পথ চেয়ে পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয় অনন্তকাল। বস্তত: এটি বর্বর রাষ্ট্রের পৈশাচিক শাসন পদ্ধতি।

গুম যাকে করা হয়, সে-ই শুধু শিকার হচ্ছেনা। তার পরিবার পরিজন নিদারুনভাবে সেই গুমের জীবন্ত লাশে পরিনত হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর প্রতীক্ষায় থেকেও তারা জানতে পারেনা তাদের গুম হওয়া প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। ‘ অন্তত লাশটা ফিরিয়ে দাও’- স্বজনদের এই আকুতিটুকুও সীমারদের পাথরবক্ষে একটুও দয়ার উদ্রেক করতে পারেনা।

গুম বর্তমান সময়ে একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক এ ঘৃন্য অপরাধ সংঘটনের তালিকায় সিরিয়া শীর্ষে। আমাদের রাষ্ট্রের নামও সে তালিকায় জ্বাজ্জল্যমান হয়ে আছে। ‘মায়ের ডাক’ নামক সংগঠণ ২০১৯ সালে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তাদের তথ্যমতে- ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৫৩৮ জন গুম হয়েছে। ৩০০ জন অনেকদিন পর ফিরে এসেছে, ৬৮ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, ১৭০ জন নিখোঁজ রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যমতে- ২০১৪ থেকে ২০১৯ (জুলাই) পর্যন্ত ৩৪৪ জন গুমের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৬০ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং ৩৫ জন ফেরত এসেছে। বাকীরা নিখোঁজ।

গুম একটি অপরাধ। আমাদের দন্ডবিধি (পেনালকোড), আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, সন্ত্রাস দমন আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন (রোম ষ্ট্যাটুট) সহ বিভিন্ন আইনে গুম একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। তথাপি রক্ষকই যেখানে ভক্ষক সেখানে প্রতিকার প্রার্থীরা কি-ই বা আশা করতে পারে! যেখানে রাষ্ট্রীয় পোষকতায় গুমের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় সেখানে বিচারের বাণী তো নিভৃতে কাঁদবেই।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর ক্রমাগত হাহাকার আকাশ বাতাস ভারী করে তুলছে। তাদের কান্নার রোল আর গগণবিদারী আহাজারিতে খোদার আরশ কেঁপে উঠছে। তাই গুম নামক পশুবৃত্তিকে নিভৃত করতে আন্তর্জাতিক সনদের যথাযথ বাস্তবয়ন চায় ভূক্তভোগীরা। সনদ গ্রহণ ও সনদে অনুস্বাক্ষর করে সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সারিতে নাম লিখাক প্রতিটি দেশ। গুমের শিকার পরিবারসমূহ থেকে অনন্ত-অসীম প্রতীক্ষার অবসান হোক।

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

সম্পাদক

ডেইলি সিএনবাংলা

Sharing is caring!

 

 

shares