সমাজ-বাস্তবতা ও একটি উপলব্ধি _ মোহাম্মদ আব্দুল হক

আমরা অনেকে মুখোশ পড়া মানবিক মানুষ সেজে পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন বৈঠকে বা সভায় মুখস্থ বুলি আওড়াই – মানুষ শ্রেষ্ঠ সামাজিক প্রাণী। কিন্তু আমরা কয়জনে প্রকৃত অর্থে এই শ্রেষ্ঠ প্রাণের গুরুত্ব বুঝি – এই প্রশ্ন রয়েই যায়। আমরা অনেকে সময়মতো বুঝি না। আবার কেউ কেউ বুঝতে পারলেও অনেকের উপলব্ধিতে আসতে আসতেই সীমাবদ্ধ জীবনের অনেক পথ শেষ হয়ে যায়। এর অন্যতম একটা কারণ হলো, চতুরতার মাধ্যমে অনৈতিক ভাবে সম্পদ জমিয়ে একলা সুখী হওয়া ও একলা ভালো চলার মানসিকতাকে প্রাধান্য দেয়া।মানুষের এমন মানসিকতায় প্রাণী হিসেবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গুরুত্ব কোথায়? ভাবতে হবে।

আমাদের একটি অনুদার, পুঁজিবাদী এবং অমানবিক সমাজ-বাস্তবতা হচ্ছে এরকম – একটি লোক জীবনের দীর্ঘ সময় সমাজের অংশ হয়ে আমাদেরই পাশে থেকে মারাত্মক অর্থ-কষ্টে থেকে সময়মতো ভালো খেতে না পেয়ে, অল্প-স্বল্প অসুখে সঠিক ডাক্তার দেখাতে না-পেরে ও ঔষধ পথ্য না খেতে পেয়ে এবং পরিবারের নূন্যতম চাহিদার যোগান দিতে না পেরে যখন বারবার মরে মরে জীবন অতিবাহিত করে, তখন পরিবার ও সমাজের অনেক আত্মীয়, স্বজন ও বন্ধু অনেকেই চোখ বন্ধ করে থাকেন অথবা দেখেও না দেখার ভান করে অথবা ওই লোকের অভাবকে পুঁজি করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাচ্ছিল্য করে থাকেন। এমনটা সবাই করেন না, তবে যে বা যারা এমন করেন, তারা যে ঠিক করছেন না, তা তাদের অনেকের উপলব্ধিতে আসে অনেক পরে। এমন-ও লক্ষ করা যায়, অভাব অনটনে মরতে মরতে এবং নিজের নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার কথা কারো কাছে ঠিক ঠিক প্রকাশ করতে না পেরে খুব কাছের ওই লোকটি একসময় শেষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কিন্তু যখন ওই লোকটি মরতে মরতে শেষ পর্যন্ত শেষবারের মতো মরার অবস্থায় উপনীত হয়, তখন আত্মীয় বা স্বজন বা বন্ধু কেউ কেউ খুব উদ্যোগী হয়ে অন্যান্য সকল আত্মীয় বা স্বজনের সহযোগিতা নিয়ে একটি মোটামুটি বড়ো অংকের টাকা জোগাড় করে ডাক্তার দেখানো ও হাসপাতাল খরচ জুগিয়ে থাকেন। এ বিষয়টিকে আমি খারাপ দেখছি না ; ভালো। কিন্তু কথা হচ্ছে, ওই শেষবার মরার সময় অনেকের ৩হাজার, ৫হাজার, ১৫হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা একত্র করে যে মোট ৬লাখ বা ৭লাখ বা ১০লাখ টাকা জোগাড় করা হয়ে থাকে, সেই টাকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাক্তার, ফার্মেসী, ক্লিনিক ও শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে এম্বুলেন্সে করে দুনিয়ায় অস্থায়ী বসবাসের কোনো বাসার বারান্দা, গাড়ির গ্যারেজ বা বাড়ির উঠুনে পৌঁছাতে খরচ হয়ে যায়। বাকি যদি কিছু থাকে, তা দিয়ে উৎসবের ঢঙে শিন্নি করে শেষ করা হয়। এখানে একটি অনুরোধ রাখছি, আপন মানুষের মরা লাশটিকে হাসপাতাল থেকে এনে বা গোসল দিয়ে অবহেলায় গাড়ির গ্যারেজে রেখে দিবেন না। এ বড়ো-ই নির্দয় আচরণ। কবরের উদ্দেশ্যে যাত্রার পূর্বে অন্তত ঘর থেকে বিদায় দিবেন।

আমি সবিনয়ে ওই সকল মহানুভব দাতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাচ্ছি, আমরা যদি কোনো লোকের শেষ বার মরার আগে তার দিকে পারিবারিক ভাবে বা সামাজিক ভাবে অনেকে মিলে মনোযোগ দিই এবং সম্মিলিত ভাবে ৩হাজার, ৫হাজার, ১৫হাজার, ৫০হাজার করে মোট ৬লাখ বা ৭লাখ বা ১০লাখ টাকা একত্র করে ওই লোকের হাতে দিতে পারি, তাহলে কিন্তু ওই লোকটি অর্থাভাবে খেয়ে না খেয়ে, চিকিৎসা না করে, পারিবারিক নানান রকম দুশ্চিন্তা করতে করতে চূড়ান্ত মৃত্যুর আগে বারবার মরতো না; বরং মোটামুটি একটা কিছু করে মোটামুটি স্বচ্ছলতায় জীবন কাটিয়ে কিছুটা শান্তি পেয়ে শেষ পর্যন্ত একবারেই মরতো।

আমরা জানি, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেককেই মরতে হবে। আবার আমরা ইসলাম ধর্মের মানবিক শিক্ষা এ-ও জেনেছি, শুধু নামাজ পড়ে, টাকা খরচ করে পশু জবাই বা কোরবানি করে আর টাকার জোরে মক্কা-মদিনা গেলেই আল্লাহকে নিশ্চিত পাওয়া যাবে এমন কথা নয় ; বরং ইসলাম হচ্ছে মানবতার ধর্ম। এখানে আমরা নিজে যে খাচ্ছি, আমরা কি আমাদের আত্মীয় বা প্রতিবেশী বা স্বজনের খবর নিচ্ছি? ইসলাম এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। অনেকেই আছে সবার কাছে তার অভাবের কথা বলতে পারছে না, অথচ পরিবার ও সমাজের মানুষ ঠিকই জানেন। তাই আমি মনে করি, পরিবার ও সমাজের সামর্থ্য অনুযায়ী সচ্ছল লোকেরা, কোনো লোককে সাহায্য করার জন্যে তার বারবার মরা দেখতে দেখতে শেষবার মরার সময়ের অপেক্ষা না করে, সম্মিলিত ভাবে খোঁজ নিয়ে, বেঁচে থাকতেই ওই লোকের অর্থকষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নেয়া অনেক অনেক মানবিক কাজ। এ ধরনের কাজে প্রথমে কোনো একজনকে উদ্যোগ নিতে হয়। তিনি অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করে একটা মোটামুটি টাকার অংক জোগাড় করে, একত্রে ওই অর্থকষ্টের জাতাঁকলে পিষ্ট হয়ে বারবার মরতে থাকা মানুষটির হাতে নিরবে তুলে দিবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন। এ আমাদের জন্যে অনেক বড়ো এক পাওয়া। মানুষ মানুষের জন্যে এবং মানুষকে ভালোবেসে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই স্রস্টাকে পাওয়া যায় – এই কথাটি মনে রেখে আমাদেরকে ভাবতে হবে এবং সে জ্ঞানকে ঠিক কাজে লাগিয়ে ইহকালের প্রকৃত সুখ খোঁজার পাশাপাশি পরকালের সুখের ঘর বানাতে হবে। মহানবী সাঃ এর এক হাদিস অনুসারে পাই, মহা মহাজ্ঞানী আল্লাহ প্রথম যে জিনিসটি সৃষ্টি করেছেন তা হলো জ্ঞান। তাই শুধু যাচ্ছেতাই ভাবে জীবন কাটানো নয় ; বরং ঠিক জ্ঞান চর্চা করতে হবে। প্রিয় সুহৃদ, ভালো থাকুন সবসময়। আল্লাহ সবাইকে জ্ঞান দান করুন। আমিন।।
# লেখক – মোহাম্মদ আব্দুল হক
কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

Sharing is caring!

 

 

shares