সিলেট ছিল বঙ্গবন্ধুর সব আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র

ডি.এইচ. মান্নাঃ হজরত শাহজালাল রহ. ও ৩৬০ আউলিয়ার স্পর্শে ধন্য পূণ্যভূমি সিলেটের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুগভীর সম্পর্ক ছিলো।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও প্রশ্ন ওঠে আসামের অংশ সিলেটের ভাগ্যে কী হবে।

মুসলমান আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার যে দায়িত্ব পড়েছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর।

১৯৪৭র ৩রা জুন এক ঘোষণায় তিনি সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারনের দায়িত্ব দেন স্থানীয় জনসাধারণের কাঁধে। সিদ্ধান্ত হলো গণভোট অনুষ্ঠানের।

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ।

মুসলীম লীগের মার্কা কী- কুড়াল ছাড়া কী, পাকিস্তান জিন্দাবাদ-লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, কায়দে আজম জিন্দাবাদ এইগুলা স্লোগান ছিল।

ভোটের প্রচারে সিলেটে মুসলিম লীগের বড় নেতারা এসেছিলেন সেই সময়ে (১৯৪৭) বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তখন প্রায় ৫০০ জন ছাত্র নিয়ে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু আসেন সিলেটে। অবস্থান করেন বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর থেকে বঙ্গবন্ধু সিলেট এসেছেন অসংখ্য বার।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আবার সিলেট আসেন। তখন তিনি প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের বন, পরিবেশ ও প্রাদেশিক মন্ত্রী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সফর সঙ্গী হয়ে তিনি সিলেট এসেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু চা-শ্রমিকদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে তিনি চা-বোর্ডের প্রথম বাঙ্গালী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার সিলেট আসা-যাওয়া ছিলো নিয়মিত।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের জনমত তৈরির সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন সমস্ত বাংলাদেশ সফর করছিলেন সেসময় তিনি সিলেটে আসেন।তখন তিনি প্রথমবারের মতো সিলেটের বিয়ানীবাজারেও গিয়েছিলেন।সে সময় সিলেট অবস্থান কালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় ৩০৫৩ দিন জেলখানায় ছিলেন। এর মধ্যে ৫ দিন তিনি ছিলেন সিলেট কেন্দ্রিয় কারাগারে। বঙ্গবন্ধুকে যে ঘরটিতে রাখা হয়েছিল বর্তমানে সেটি বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম নামে সংরক্ষন করে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি লাইব্রেরি। কারণ এই ঘরটিতে বসেই বঙ্গবন্ধু চিঠি লিখতেন তাঁর স্বজনদের কাছে।

এরপর ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের দলীয় কাজে সিলেট এসেছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন সিলেটের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সেই সময় তালতলা গুলশান হোটেলে অবস্থান করেন তিনি।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকবার সিলেটে আসেন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জন্য সমাবেশে বক্তৃতা দেন। সবচেয়ে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কর্নেল ওসমানীর নির্বাচনী এলাকা ফেঞ্চুগঞ্জে।
তখন বঙ্গবন্ধু কর্নেল ওসমানীর সিলেট নাইওরপুলস্থ বাসায় উঠেছিলেন।

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করার পর সারাদেশে গণসংযোগ করেন তখন তিনি সিলেটও আসেন।
আবার যান সিলেটের বিয়ানীবাজারে। সে সময় বঙ্গবন্ধু বিয়ানীবাজার সদর পোষ্ট অফিস মোড়ে জনসভায় ভাষণ দেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন- বিয়ানীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে আমার মনে হচ্ছে এটি যেন বাংলার কাশ্মীর।

সে সময় তিনি গণসংযোগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলেও যান। বঙ্গবন্ধু আগমনের খবর শুনে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভিড় করেন বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য। কথা ছিল বেলা ২ টায় আসবেন কিন্তু আসলেন রাত তিনটায়। শ্রীমঙ্গল শহর তখনও লোকে লোকারণ্য। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধু আপ্লুত হন। বঙ্গবন্ধু সে সময় উঠলেন আব্দুল আলীর বাসায়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও সিলেট এসেছিলেন জনতার বঙ্গবন্ধু।

সিলেটে রয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য সহযোদ্ধা ও সহচর। তাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পর্যায়ে নানা আন্দোলন সংগ্রাম ও দেশ গঠনে কাজ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সহচরদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজি, সাবেক মন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গনি উসমানি, মুক্তিযুদ্ধের উপ সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ রব, কমান্ট্যন্ড মানিক চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মোস্তফা আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা আসাদ আলী, ইসমত আহমদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান চৌধুরী ছানু মিয়া, মাওলানা ওলিউর রহমান, আজিজুর রহমান প্রমুখ। সিলেটের আমলাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্নেহ করতেন এম এস কিবরিয়া, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও আব্দুল মাল আবদুল মুহিতকে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় সিলেট ভৌগোলিক অবস্থান পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রে ( বর্তমান বাংলাদেশ) রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। উনার কর্মের মধ্যদিয়ে সিলেটের মানুষ মনে রাখবে জনতার বঙ্গবন্ধুকে।

তথ্যসূত্রঃ সিলেটে বঙ্গবন্ধু (বই) বিসিবি বাংলা / অসমাপ্ত আত্মজীবনী (বই)
লেখক-স্টাফ রিপোর্টার, ডেইলী সিএন বাংলা।

Sharing is caring!

 

 

shares