যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া এক নীল দৈত্যের গল্প

শেখ রিদওয়ান হোসাইনঃ

জন্মের মাত্র ৫ বছর পরেই আর্থিক সমস্যা থাকায় শরণার্থী হয়ে মাতৃভূমির মায়ার বাধন ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো ফ্রান্সে। চাচা মাইকেল গবার হাত ধরে সেখানে সেই ছোট্ট ছেলেটির সখ্য হয়ে যায় ফুটবল জিনিসটার সাথে। তার পরিবার, বন্ধু সবাই তাকে ডাকতো ‘তিতো’ নামে। যার বাংলা অর্থ দাড় করালে হয় ‘দৈত্য’! আর সেই দৈত্যটা হলেন ‘দিদিয়ের দ্রুগবা’।

সে জন্মের পরেই দেখেছে কিভাবে ঘনবসতি এলাকার সাথে মানানসই হতে হয়। আর্থিক অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিলো যে ঘরের টেবিলে পর্যন্ত খাবার পর্যাপ্ত আসতো না। হয়তো পেটের ক্ষুধাই সে ফুটবল দিয়ে মিটিয়ে দিয়েছে তার দানবীয় সব মূহুর্ত গুলো দিয়ে।

পরিবার যখন চরম অর্থনৈতিক মন্দায় চাচা মাইকেল গোবার সাহায্যেই তাদের পরিবার চলতো। কারণ বাবা মায়ের রুজি দিয়ে দ্রুগবার পরিবার আর চলতে পারছিলো না। পরিবারের সবাই তখন আশা রাখেন ফ্রান্সে থাকা গোবা আসবেন এবং তাদের দেখভাল করবেন। কিন্তু গোবার আইভেরি কোস্ট ভ্রমণের ভিসা তৎকালীন ফ্রান্স সরকার দেয় নি।

ঠিক তখন দ্রুগবার পরিবারের সামনে একটি শেষ অপশন টিকে থাকে। তাদের হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে শুধু একজন ফ্রান্সে চাচার কাছে পাড়ি জমাতে পারবেন। এ নিয়ে পরিবারে ভীষণ তর্কাতর্কি, কাকে পাঠাবেন ফ্রান্সে চাচার কাছে। শেষমেশ ঠিক হয় ছোটো টিটোই(দ্রুগবা) একা যাবে ফ্রান্সে।

এই সফরটি ছিলো দ্রুগবার প্রথম কোনো সফর। অত্যন্ত গরীব ছোট্রো বালকটির অবাক করা চোখ প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজ দেখলো। বিস্মিত সে চোখ জোড়ায় তাকে আরোও অদ্ভুদ দেখাচ্ছিলো তার গলায় ঝুলে থাকা একটি লেবেলের জন্য। যেখানে লিখা ছিলো ‘ দিদিয়ের দ্রুগবার সাক্ষাত হবে প্যারিসের মাইকেল গোবার সাথে’। ভিন্নরকম কিছু দেখতে পেয়ে এয়ারপোর্টে থাকা প্রত্যেক লোকই তার দিকে অবাক নজরেই তাকাচ্ছিলো।

ফ্রান্সে পাড়ি জমানোর পর প্রাথমিক দিনগুলোও তার সুখকর ছিলো না। একদিকে পরিবার চাচ্ছিলো সে যেনো একাডেমিকাল পড়ালেখার সাথে মিল রেখে খেলার দিকে মন দেয় আবার চাচার ইচ্ছে তাকে প্রফেসনাল ফুটবলার হিসেবেই গড়ে তুলবেন। শেষ পর্যন্ত চাচার পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই তাকে ফ্রান্সের একটি ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করানো হয়। তার রাজকীয় ক্যারিয়ারের প্রথম যাত্রা যেখানে শুরু। যদিও পরিবারের চাপে শেষ পর্যন্ত একাডেমিক ও প্রফেসনাল দুটি দিকই সামাল দিতে হয়েছিলো।

ফ্রান্সে আসার বেশি দিন হয় নি,এমন সময়ই ছোট্রো বালক দ্রুগবা পরিবার থেকে দূরে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেছিলো। ছোটো ছেলের সরল মনটাতে তার বাবা-মা পরিবারের সব স্মৃতি উকিঁ মারছিলো যা তাকে ক্রমেই ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলো। তিনি ফ্রান্সের ওইদিনগুলো সম্পর্কে বলেন

“আমার মনে পড়ে ফ্রান্সের প্রথম দিনগুলো। আমি অনেক বেশি কান্না করতাম,প্রতিটা দিনে যখনই আমি একাকীত্ব বোধ করতাম। এটা এ জন্য নয় যে আমি ফ্রান্সে, আমি অন্য জায়গায়ও হতে পারতাম। আমি কাঁদতাম শুধু এটা ভেবে আমার বাবা-মা অনেক দূরে,অনেক। আমি তাদেরকে প্রচন্ডভাবে মিস করতাম”।

এই মানসিক যন্ত্রণা দ্রুগবা ৩ বছরের বেশি সহ্য করতে পারেননি। তার চাচা একপ্রকার রাগান্বিত হয়েই তাকে আইভেরি কোস্টের আবিদজানে ফিরিয়ে দেন যেখানে তার পিতা-মাতা তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবে বিধিবাম, আইভেরি কোস্টের অর্থনৈতিক মন্দা তখনও কাটেনি। দারিদ্র্য আরোও একবার তাকে তীব্রভাবে আকড়ে ধরে।

তার বাবা-মা স্কুল ফি দিতে পারেনি যার জন্য দ্রুগবার পড়ালেখা থমকে দাড়াঁয়। বালকটি আবার বল নিয়ে ছোঁটা শুরু করে। পাড়ায় বন্ধুদের সাথে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত ট্রেনিং চালু রাখে সে।

এমতাবস্থায় তার বাবা-মা চাকরি হারিয়ে ফেলে। একেবারে নিঃস্ব অবস্থার মুখোমুখি হয় তার পরিবার। দরিদ্রতার সর্বশেষ সীমানায় যখন দাঁড়িয়ে, তখন লজ্জ্বা ভেঙেই চাচা গবার সাহায্য চায় তারা। দ্রুগবাও তার প্রথম ফ্রান্স ছাড়ার ভুল স্বীকার করেন। ভাগ্যক্রমে রাগান্বিত অবস্থায় থাকা চাচা তাকে আবার সাহায্য করার জন্য সদয় হয়ে যান,দ্রুগবা দ্বিতীয় বারের মতো ফ্রান্সের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা হয়।

চাচার দ্রুগবার পিতা-মাতাকে সম্মান করেই তাকে আবার একাডেমিক পড়াশোনার জন্য গুরুত্ব দেন। তবে পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে দ্রুগবাকে ফুটবল শিখাতে থাকেন। দ্রুগবা তখন ছিলো রাইট ব্যাক পজিশনের প্লেয়ার। ১৯৯৩ সালে ‘লেভেলোস এসপি’ নামের একটি ক্লাবের সাথে তাকে যুক্ত করেন চাচা।

ধীরে ধীরে গড়াতে থাকে সময়। ১৪ বছর বয়সে দ্রুগবার নিজেরও তখন খেলার চাইতে পড়ালেখার দিকেই মনোযোগ বেশি। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ফুটবলও খেলে নিতেন তিনি। স্কুল জীবন শেষ করেই চাচ্ছিলেন ‘মেইন(Maine) ইউনিভার্সিটি’থেকে এ্যাকাউন্টিং ডিগ্রি নিতে। পাশাপাশি লা-মেনসের হয়ে ফুটবলও চালিয়ে নিচ্ছিলেন।

তবে দ্রুগবার নিজের কাছে ডিগ্রি নেওয়াটাই প্রাধান্য ছিলো ফুল টাইম ফুটবল খেলার চেয়ে! তিনি প্রফেসনাল ফুটবলার হতে চান নাই তার ওই ডিগ্রি নেওয়ার আগে। ২১ বছর বয়সে ডিগ্রি অর্জন করার পর তার সমস্ত ধ্যান ফুটবলে দিয়ে দেন। যেখান থেকে তার জীবনের এক আশ্চর্য অধ্যায়ের শুরু…

(দ্বিতীয় পার্টে বাকি অংশ থাকবে)

Sharing is caring!

 

 

shares