সবাই চায় সুখের বাড়ির ঠিকানা

মো.মশিউর রহমান:

সুখ একটি অলিক বস্তুু। একটি মরিচিকা। যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কিন্তু সারা জীবন এর পেছনে ছুটতে হয়। এটি একটি নেশা। সুখ একটি অনুভুতির নাম। মানুষ মাত্রই জীবনভর সুখের সন্ধানে ব্যস্ত সময় পার করছে। কিন্তু কিসে প্রকৃত সুখ সেটা কেহই জানে না। যেহেতু সুখ পরিমাপের কোন যন্ত্র এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয় নাই। তাই প্রকৃতপক্ষে কে কতটুকু সুখি তা নির্ণয় করাই কঠিন। যদিও বলা হয়ে তাকে Face indicates the mind । চোখ মনের কথা বলে । চোখ যে মনের আয়না। তাহলে কি মানুষের মুখ ও চোখ দেখে সুখী মানুষ চিহ্নিত করা যায়? প্রকৃতপক্ষে সুখী মানুষ কারা ? কোথায় গেলে সুখ পাওয়া যায়? সুখের ঠিকানা কি কেহ জানেন? এ বিষয় গুলো অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে। কেহ প্রচুর অর্থের মাঝে সুখ খোঁজেন, কেহ বিত্তে, কেহ চিত্তে, কেহ নারীতে, কেহ ক্ষমতায়, কেহ বৈরাগ্যে, কেহ সঙ্গীতে, কেহ সাহিত্যে, কেহ মানবিকতায়, কেহ ত্যাগে, কেহ উদারতায়, কেহ ভালোবাসা বিলিয়ে, কেহ সৃষ্টিকর্তার আরাধনায়, কেহ স্মৃতিচারণে, কেহ পারিবারিক দায়িত্ব পালনে, কেহ সামাজিকতায়, কেহ আথিতেয়তায়, কেহ সারাক্ষণ আমি বড় এই ভাবনায়, কেহ প্রকৃতি দর্শনে, ভোরের সূর্যোদয়ে, বৃষ্টির শব্দে, নদীর বয়ে যাওয়া কুল কুল শব্দে, সবুজ পাহাড়ে, বিশাল সমুদ্রের জলরাশিতে, কেহ মুগ্ধতা ছড়ানো প্রিয়ার কালো চোখের দিকে তাকিয়ে, কেহ অভিজাত্যে, কেহ দাপুটের বড় চাকুরীতে যেখানে সর্বদা জী হুজুর, জী হুজুর, স্যার স্যার শুনা যায়, কেহ মোসাহেবীতে, কেহ র্কাপণ্যে, কেহ অধিক অর্থ ব্যয়ে, কেহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনে, কেহ শাসন শোষনে, কেহ নিপীড়নে, কেহ অন্যকে প্রতারিত করে, কেহ দূর্নীতি করে, অন্যজনের সর্বস্ব লুন্টন করে। কোথায় কোথায় সুখ খোঁজা হয় লিখতে গেলে সেই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। কোথায় সুখের বাড়ি সেটা যদি লোকজন জানতো তাহলে সবাই হুমড়ি খেয়ে সেখানেই পড়তো। সুখের বাড়ির ঠিকানা খোঁজায় সবাই অস্থির। তবে একটা জিনিস সবার মাঝেই পরিস্কার মিথ্যা ও অসৎ জীবন যাপনের মধ্যে আর যাই হোক সুখ শব্দটি অনুপস্থিথ। সংসার জীবনের শুরুতে আমার সহর্ধীনীকে বলেছিলাম মিথ্যার মধ্যে কোন সম্পর্কইবেশি দিন ঠিকে থাকে না। সেই থেকে দুজন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মিথ্যা দিয়ে সংসার সাজাব না। তখন থেকে সত্যের একটি শক্ত ভিটের উপরে সংসার সাগরের ভেলা চলছে। আজ প্রায় এক যুগের উপরে। আমরাও সুখের বাড়ি খুঁজি। জোসনা রাতে বাসার ছাদে সন্তানসহ আকাশের তারা দেখি। ভরা পূর্নিমার চাঁদ দেখি। সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবি। খুঁজি সুখের ঠিকানা। বিলাস জীবনে কি সুখ পাওয়া যায়? দেখা যায় বিলাস বহুল জীবন যাপনের মধ্যে সুখের অভাবে লোকজন আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। কিছুদিন পূর্বে বোম্বে জনপ্রিয় চলচিত্রের তরুণ অভিনেতার আত্মহত্যাই সেটাই প্রমাণ করে। বিপরীতে ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে দরিদ্র লোকটি সুখে নিদ্রাযাপন করতে পারে। যেখানে বিত্তশালী লোকটি কোটি টাকার খাটে ঘুমের ঔষদ খেয়ে একটু ঘুমের আশায় চোখ বন্ধ করে এপাশ ওপাশ করে বিনিদ্র রাত পার করেছেন। ছেলেবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়েছি সুখী মানুষের সন্ধানে গল্পটি। এক রাজা কঠিন এক ব্যাধিতে পড়লেন। রাজ্যের সকল ডাক্তারের চিকিৎসায় রাজার অসুখ সাড়ে নাই। এক কবিরাজ তাকে পরামর্শ দিলেন রাজা অসুখ থেকে সেড়ে উঠবেন যদি তিনি একজন সুখী মানুষের জামা পরিধান করেন। রাজার আদেশে সুখী মানুষের জামার সন্ধানে পাইক পেয়াদা রাজ্যের চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়লেন সুখী মানুষের জামার খোঁজে। এক সময় এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে একজন সুখী মানুষের সন্ধান পাওয়া গেলো। তাকে রাজার অসুখের কথা বলা হলো। তাকে বলা হলো তার একটি জামা দেয়ার জন্যে। সব শুনে সেই সুখী মানুষটি হাসি দিয়ে বলল আমার তো কোন জামা নেই। এই গল্পটি আজো মানুষের মুখে মুখে। জীবন এমনই সুখী হবার জন্যে জামার প্রয়োজন নেই। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তেই উঠে আসছে লোকজনের সুখের অনুভুতি। কেহ কতটুকু সুখী তারই চিত্র ফেসবুকে দেখানোর তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। ঈদের আজ দ্বিতীয় দিন। ফেসবুকে চলছে ঈদের ধারাবাহিক আপডেট। কোরবানির গরুর সাইজ, জবাই করা, ঈদের জামাত, আউটিং, ফ্যামেলির ছবিসহ আপডেট। এসব ছবি আপলোডের সাথে সাথে পাওয়া যাচ্ছে লাইক, কমেন্ট, লাভচিহ্নসহ হাজার হাজার ভালোভাসার অসাধারণ অনুভুতি। সময়ের আবর্তনে এটাও এক ধরনের সুখানুভুতি। সুখের সন্ধানে আমরা আজ ভীড় করছি সোসাল মিডিয়ায়। ভালো মানুষী সাজার জন্যে ছবি পোস্ট করছি অন্যের প্রশংসা পাবার আশায়। সেই প্রশংসাও এক ধরনের র্ভাচুয়াল সুখ। নিজের প্রতিভা প্রকাশে কবিতা, গল্প, গান, আবৃত্তি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করছি প্রশংসার আশায়। যত প্রশংসা তত সুখ। তত আনন্দ। আর যদি কেহ কোন বিরুপ মন্তব্য করেন। তার সাথে বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। তাকে বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। বিভিন্ন উৎসবে নিজের ছবিটা কত সুন্দর করে ফেসবুকে আপলোড করা যায় সেই চিন্তা মাথায় থাকে। সেটাও একটা ভালোলাগায় আশায়। এটাতেও সুখ কম কিসের? তবে ভার্চুয়াল জগতের এসব অলিক সুখের চেয়ে বাস্তব জগতের সুখের মাত্রা অধিক। সুখের ঠিকানা কারো জানা না থাকলেও সুখের অবস্থান একেবারে অজানা নয়। স্ত্রীর আদর মাখানো ভালোবাসার হাতের ছোঁয়ায় তৈরী এক কাপ চা বা কফিতে সুখ, বাবা মা, ভাই বোনদের সাথে প্রাণ খোলে কথা বলার সুখ, বাল্যবন্ধুর সাথে প্রাণখোলে আড্ডার সুখ, দুঃখি ছেলে মেয়েদের মাথায় হাত দিয়ে ঈদের উপহার তুলে দেয়ার সুখ, রিক্সা ড্রাইভারকে ভাড়ার অতিরিক্ত কয়েকটি টাকা দেয়ার সুখ, বেতনের বাহিরে কাজের বুয়ার হাতে বাড়তি কিছু টাকা তুলে দেয়ার সুখ, লুকিয়ে গ্রামের হত দরিদ্র কিছু মানুষের বাড়িতে এক বেলা ভালো খাবারের ব্যবস্থা করার সুখ, দরিদ্র লোকটিকে বিনা ফীতে ডাক্তারের চিকিৎসা দেয়ার সুখ, অবৈধ টাকায় ছাড়া নিজ দায়িত্বে অফিসের কাজটি করে দেয়ার সুখ সত্যিই অসাধারণ। একজন মানবিক মানুষ হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আনন্দ সেটা ভাষায় প্রকাশ যাবে না। ভুল ঠিকানায় সুখের সন্ধানে যারা কালক্ষেপন করছেন তাদের রাস্তা পরিবর্তন করে সঠিক পথে হাটা উচিত। ভালোবাসাময় বিশ্বে ভালোবাসাহীন মানুষের বসবাস শোভা পায় না। অর্থই যদি সুখের মাপকাটি হতো তাহলে পৃথিবীতে সকল অর্থশালী ব্যক্তিরাই সুখী থাকতো। সুখের সাথে অর্থের সম্পর্ক থাকলেও জীবনময় অর্থের পিছু ছোটা লোকটি সুখের ঠিকানা না পেয়ে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ প্রান্তে জীবনটাকে অর্থহীন মনে করেন। যা চেয়েছিলেন সেই অর্থ তিনি পেয়েছেন কিন্তু একটি সুখী সংসারে স্ত্রী, সন্তানের ভালোবাসা হারিয়েছেন। সংসারে ও সংসারের বাহিরে ভালোবাসার মাধ্যমে সুখের সন্ধান পেতেন কিন্ত সে রাস্তাতে তিনি হাটেন নাই। সুখ তার কাছে ধরা দেয় নাই এর অন্যতম কারণ তিনি জীবনটাকে সঠিক ভাবে পরিচালিত করতে পারেন নাই। উপভোগ করতে পারেন না। সমাজে কিছু ব্যক্তি থাকেন যাদের সাথে কথা বলা শুরু হলেই নিজের অর্থে বিত্ত, ফ্লাট, গাড়ি বাড়ির হিসেব দিতে শুরু করবেন। এতেই তার তৃপ্তি। যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় চাকুরীতে তিনি কোন গ্রেডে বেতন পান তাহলে তিনি নিরুত্তর থাকবেন। এই উত্তর দিতে না পারায় তার অর্জিত সম্পদ তাকে উপহাস করে। একটা মিথ্যে অহমিকা, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতার দাপট, সুখী মানুষের মিথ্যে অভিনয় দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। এক সময় তিনি এক মানসকি যন্ত্রনায় ভোগেন। সুখের আশায়, শান্তির আশায় ধর্মের ছায়া তলে আশ্রয় খোঁজেন। সুখ ছাড়া যেমন জীবনে শান্তি পাওয়া যায় না। তেমনি বিপথে চালিত হয়ে সুখের খোঁজে অসুখী জীবনেও যন্ত্রণা থামে না। পৃথিবী আজ কঠিন অসুখে দিন পার করছে। পৃথিবীর মানুষেরা সুখের খোঁজে দিন রাত পাড় করছে। সেই সুখের দিনের আশায় আমরা সবাই অস্থির। আর ধৈর্য নেই। সেই সুখ পাখিটি আমরা আবার কবে দেখতে পাবো? সবার হাতে ধরা দেবে। আসুন করোনাময় বিশ্ব শেষে আমরা সবাই মানবিক মানুষ হিসেবে সুখের বাড়ির দিকে যাত্রা করি। জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী মান্না দে’র গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করছি

সবাই তো সুখী হতে চায়
তবুও কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না
জানি না বলে যা লোকে সত্যি কিনা
কপালে সবার নাকি সুখ সয় না

লেখক:
মো.মশিউর রহমান
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ
বিশ্বম্ভরপুর সরকারি দিগেন্দ্র বর্মন কলেজ, সুনামগঞ্জ

Sharing is caring!

 

 

shares