করোনাভাইরাসে অনলাইনে ক্লাসঃ বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা

আবদুল কাদির জীবনঃ করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) ইতিহাসে এক যুগান্তকারী চেইন্জমেকার শক্তিশালী মহামারীর নাম। আমাদের মননে -মগজে, আমাদের শিরা-উপশিরায়, আমাদের চিন্তা-চেতনায় এখন একটিই নাম ‘করোনা’। আমরা হারিয়েছি মূল্যবান অনেক কিছু, পেয়েছি নতুন কিছু।

করোনাকালে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ইউনিভার্সিটি সহ সবধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়ায় মনোযোগি রাখতে পুরোদমে শুরু হয়েছে অনলাইন ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে লেখাপড়া। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়াশোনা বন্ধ আছে। এ জন্য বিকল্প মাধ্যমে ঘরে বসে এই লেখাপড়া দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি কোচিং-প্রাইভেট-টিউশনও চলছে অনলাইনে। পরিস্থিতি এমনই যে, সনাতনী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দিন দিন যুক্ত হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায়।

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ইন্টারনেটের ধীরগতি, স্মার্টফোন ও টেলিভিশনের অভাব এবং আর্থিক সংকটসহ অন্য দিকগুলো অনলাইন শিক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়ে ৪০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনের মাধ্যমের লেখাপড়ায় যোগ দিতে পারছে না। এ অবস্থায় অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য ক্লাস নেয়ার সরঞ্জাম (ডিভাইস) ও ইন্টারনেট সংযোগ এবং ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে শিক্ষাদান করে যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়েও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখা যেতে পারে। তিনি বলেন, অনলাইন শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজের ব্যাপারে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। দ্রুত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

চলতি মহামারীকালে অনলাইন এবং দূরশিক্ষণ পদ্ধতির এই পাঠদানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। খুলনা এন ডব্লিউ ইউ অনলাইন একাডেমিক ফোরাম এর সভাপতি, ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যান সায়েন্স এর ডীন এবং ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক গাজী আব্দুল্লাহ হেল বাকী তিনি ‘ডেইলি সি এন বাংলা‘ কে বলেন, বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সকল দেশসহ বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। স্বাভাবিক জীবন যাত্রা এক ভয়াবহ এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যে চলছে। সার্বিক শিক্ষা কর্মকান্ডও পড়ছে এর ক্ষতিকর প্রভাব। এরকম মুহূর্তে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বহুদেশে অনলাইনে শিক্ষা কার্য ক্রম বিভিন্ন স্তরে চালু করতে বাধ্য হয়েছে। সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো পুর্নাঙ্গভাবে চালু করতে সক্ষম না হলেও, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুলোবেশ জোরে শোরে তুলনা মুলক দক্ষতার সাথে এই ব্যবসায় সাফল্য আনোয়নে কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের দেশ মধ্যম আয়ের দেশ, সূদুর গ্রামগঞ্জে সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎতের ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী অনলাইনের ক্লাস থেকে বঞ্চিত। এই মহামারীকালে সরাসরি পদ্ধতির লেখাপড়া পরিচালনা সম্ভব নয়। কবে নাগাদ আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারব তাও নিশ্চিত নই। তাই ছেলেমেয়েদের পড়ার চর্চা রাখাটাই এখন মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এই বিবেচনায় নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও অনলাইন বা টেলিভিশন মাধ্যমে লেখাপড়া পরিচালনার বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির এই অগ্রগতিকালে একটা সময়ে আমাদেরকে অনলাইন পাঠদানে যেতেই হতো। করোনা হয়তো সেটা আমাদেরকে আরও কাছে এনে দিয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা চিহ্নিত হচ্ছে তা নিরসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ছুটির এমন পরিস্থিতির কারণে সরকারি নির্দেশে জোরেশোরে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। যদিও এ ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেশি ভূমিকা রাখছে। অনলাইনে ক্লাস চালানোর জন্য গুগল ক্লাসরুম, মেসেঞ্জার, ফেসবুক গ্রুপ, জুম, গুগল মিট, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। যদিও টেলিভিশন ও অনলাইনের মাধ্যমে এই পাঠদানের সুবিধা সব শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। ব্র্যাকের এক সমীক্ষায় বলা হয়, মোট শিক্ষার্থীর অন্তত অর্ধেকের বাসায় টেলিভিশন নেই। তারা টিভির পাঠদান পাচ্ছে না। আর বায়োটেড নামে আরেক সংগঠনের সমীক্ষা অনুযায়ী, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্লাস করার জন্য ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ৭৭ শতাংশই আগ্রহী নন অনলাইন ক্লাসে। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী টেলিভিশন পাঠদানের অধীন চলে এসেছে। অনলাইনে শিক্ষার্থীও দিন দিন বাড়ছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এমসি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র নুরুল হুসাইন ফারুক ডেইলি সি এন বাংলা কে বলেন,
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে প্রায় চার মাস হয়ে গেলো স্কুল – কলেজ বন্ধ,বলতে গেলে আমাদের শিক্ষা জীবনের বড় ধরণের একটি ক্ষতি । যেটি আমাদের কে বই – পুস্তক থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে। যদি ও স্কুল লেভেলের শিক্ষার্থীদের জন্যে অনলাইন ক্লাস এর কিছু ব্যবস্থা ছিলো তা শুধু শহরের শিক্ষার্থীরা কিছু উপকার পেলেও গ্রাম পর্যায়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তার কুনো উপকার ভোগ করতে পারেনি মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেট এর অভাবে। তাই সকল শিক্ষার্থীরা যাতে এটাতে যুক্ত হতে পারে এই ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের দ্রুত কাজ করা উচিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট শহরে এবং জেলাগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস হচ্ছে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে, ফেসবুকে গ্রুপে, ফেসবুক পেজে, ওয়াসআপ এ্যাপে, ইউটিউবে ভিডিওর মাধ্যমে। সেখান থেকে শিক্ষকরা ফেসবুক লাইভে ক্লাস করাচ্ছেন। একইরকম স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করে জুম অ্যাপে লাইভ ক্লাস নেয়া হচ্ছে। পরে ভিডিওগুলো ফেসবুকে তুলে দেয়া হয়। এ ছাড়া ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের সেইম ওয়েতে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। সিলেট শহরাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশকিছু স্কুল, কলেজ অনলাইনে ক্লাসের পাশাপাশি পরীক্ষাও নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের হাঁসকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা প্রাপ্ত, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোছা্ম্মৎ সাজবিন আক্তার অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ডেইলি সি এন বাংলা’ কে বলেন, সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৬নং পূর্ববীরগাঁও ইউনিয়নের হাঁসকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, উপজেলায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা প্রাপ্ত শিক্ষিকা মোছাম্মৎ সাজবিন আক্তার তিনি  ডেইলি সি এন বাংলাকে বলেন, করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী চেইন্জমেকার শক্তিশালী মহামারির নাম। সারা পৃথিবীকে স্বব্ধ করে দিয়েছে।এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ইউনিভার্সিটি সবি এখন বন্ধ। সরকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে সংসদ টিভির মাধ্যমে পাঠদান শুরু করেছিল। সংসদ টিভির মাধ্যমে পাঠদান শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা উপক্রিত হলেও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তা থেকে বঞ্চিত। বেশিদিন পাঠদান বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনা অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এমতবস্থায় তাদের পড়াশোনা এবং মনোবল ঠিক রাখতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে অনলাইন ক্লাস। যা শহরাঞ্চলের ছেলেমেয়েরা সফল হলেও গ্রামাঞ্চলের বা গ্রামগঞ্জের ছেলেমেয়েরা তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না কারণ স্মার্ট ফোন না থাকা, জুম মিটিং সম্পর্কে ধারণা না থাকা, নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকা।

অভিভাবকের বক্তব্যে একটি বেসরকারি সেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের সভাপতি, কলামিস্ট আছলাম হোসেন তিনি সি এন বাংলা কে বলেন, অনলাইন ক্লাস সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। ছেলেমেয়েরা ঘরের মধ্যে থেকে অস্থির হয়ে গিয়েছিল। তারা নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিল। অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া সচল রাখার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। তবে অনলাইন এবং টেলিভিশন মাধ্যমে পাঠদানের মান এবং উদ্দেশ্য নিয়েও আপত্তি আছে তাদের। অনেকেই মনে করছেন, লেখাপড়ার চেয়ে বেশিরভাগের টিউশন ফি আদায়ই এ ক্ষেত্রে মুখ্য উদ্দেশ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মে মাসের দিকে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে একই সময়ে কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল শ্রেণি কার্যক্রম চালায়। আর সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হলে চলতি মাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র বলেন, গত ১৫জুন থেকে সিলেটের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জুম অ্যাপ ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ৫০ শতাংশের মতো। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গ্রামে আছে। গ্রামে ইন্টারনেট কানেকটিভিটির এবং গতির সমস্যা প্রকট বলে জানিয়েছে অনেক ছাত্রছাত্রীরা। এ ছাড়া অনেকের স্মার্টফোন নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের। এসব শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট ডেটা কেনার ক্ষেত্রেও সংকট আছে। যে কারণে অনলাইন ক্লাসে সব শিক্ষার্থীকে পাওয়া যাচ্ছে না।

Sharing is caring!

 

 

shares